ক্রোকোডাইল আইল্যান্ড

[ফার্মাসিস্ট শ্রী অশোক নাগ রায়ের প্রয়াণে তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে উত্তর দমদম সমাজ কল্যাণ সমিতির মুখপত্র 'অন্য দৃষ্টি' পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর একটি সাক্ষাৎকার পুনঃপ্রকাশ করা হল।] 

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কিত পর্যালোচনা এবং একটি তথ্যবহুল সাক্ষাৎকার 

'ডাক্তার মানে তো মানুষ নয়, আমাদের কাছে সে তো ভগবান' - নচিকেতার এই বিখ্যাত গানের বিধাতা স্বয়ং আজ রুঢ় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতালে রোগী মৃত্যু, অতি খরচ, তৎপরতার অভাব এবং জনরোষের প্রতিফলনকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার ১৬ই মার্চ ২০১৭য় পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য আইন বলবৎ করেছে। এই আইন চিকিৎসাকে পরিষেবা ব্যবসার স্বীকৃতি দেওয়ার সাথে সাথে সেবার মনোবৃত্তি নিয়েই মুনাফা করার স্ববিরোধী নিদান দিয়েছে। এই আইন রোগী চিকিৎসা সম্পর্কিত কিছু কড়া নিদান, যেমন দুর্ঘটনাগ্রস্থ রোগীর টাকা় দেওয়ার ক্ষমতা বিবেচনা না করেই চিকিৎসা শুরু করা, চিকিৎসার প্যাকেজের খরচ আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া ও অপরিবর্তিত রাখা, জনগণের অভিযোগ নথিভূক্ত করা ইত্যাদি, দিলেও তার ফাঁকফোকর সরকারের তোলাবাজির উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলিকে। নিয়ামক সংস্থার মনোনীত, নির্বাচিত নয়, সদস্যদের অন্তত তিনজন এই মুহূর্তে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের ডিরেক্টারস বোর্ডের সদস্য। ফলে তারা ওইসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের ব্যবস্থা কিভাবে নেবেন বা স্বার্থের সংঘর্ষ এড়াবেন? তাছাড়া ওই নিয়ামক সংস্থার সিদ্ধান্তকে ফৌজদারি আদালতের এক্তিয়ারের বাইরে  রাখা হয়েছে। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হল, এই আইন অনুযায়ী চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান তখনই অপরাধ যখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর আর্থিক ক্ষমতা সম্পর্কে দ্বিধাহীন। অর্থাৎ গয়না বন্ধক বা ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের কাগজপত্র আটকে রেখে হাসপাতালও এবার ফাটকা কারবারে উন্মত্ত হতে চলেছে। ২০১০ সালের পূর্বতন আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অনাদায়ী বিল সরকারি তহবিল থেকে মেটানোর ধারা এই নতুন আইনে চুপিসারে ঝেড়ে ফেলা হয়েছে। এমতাবস্থায় জনগণের উপর সাঁড়াশি আক্রমণ স্বরূপ কেন্দ্র সরকার ২০১৮ সালে মেডিকেল কাউন্সিল বিলটি এনেছে। এই বিল অনুযায়ী সারা দেশের মেডিকেল পড়ার মোট আসনের ৬০ শতাংশ প্রাইভেট কলেজের অধীন থাকবে, যার মাত্র ৫০ শতাংশ আসনের ফি-এর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। মেডিকেল পড়াশোনার পঞ্চম বর্ষের পরীক্ষা, একটি কমন পরীক্ষা, ন্যাশনাল এক্সিট টেস্ট বা নেক্সট হিসেবে পরিচালিত হবে যাতে সাধারণ ডাক্তারি পড়ুয়াদের সঙ্গে আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি, ইউনানী প্রভৃতি কোর্সের পড়ুয়ারাও বসতে পারবে এমবিবিএস-এর সমতুল্য ডিগ্রীর জন্য। অন্যান্য কোর্সের রোগ নির্ণয়ের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জ্ঞানের তারতম্যের নিরিখে পৃথক স্বীকৃতির বদলে খণ্ডজ্ঞানকে স্বীকৃতি দিয়ে ক্রস প্র্যাকটিসকেই আইনি মান্যতা দেওয়া হবে এর মাধ্যমে। তাছাড়া মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার ২৫ জন সদস্যদের মধ্যে ২০ জনই হবে মনোনীত, নির্বাচিত নয়। 'জীবন নিয়ে খেলা' সিনেমার চিত্রনাট্য যখন বাস্তবের মরুভূমিতে পদার্পণ করেছে, তখন কোয়াক ডাক্তারদের বিরুদ্ধে জনরোষ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ভুঁয়ো ডাক্তারদের ধরা পড়ার ঘটনা কোয়াক ডাক্তারদের সামাজিক মানহানি ঘটাচ্ছে, যেখানে তাদের হাতেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা টিকে রয়েছে। আজও গরীব মানুষের সহায় তারাই কিন্তু এই নয়া বিল বিপজ্জনকভাবে একদিকে খণ্ডজ্ঞানকে স্বীকৃতি দিলেও ডাক্তারদের অ্যাসিস্ট্যান্টদের নিয়োগ সম্পর্কে উদাসীনই শুধু নয় বরং কোয়াক ডাক্তারদের কার্যকলাপকে বেআইনি ঘোষণা করে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বলবত করার কথা ভাবা হচ্ছে। অন্যদিকে জয়েন্ট এন্ট্রেন্স পরীক্ষার উত্তরসূরী 'নিট' ডাক্তারি পড়ুয়াদের মান কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগে জর্জরিত। পূর্বতন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কাট অফের বদলে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পার্সেন্টাইল (৪০ তম পার্সেন্টাইল প্রাপক বলতে বোঝাবে ৪০ শতাংশ পরীক্ষার্থী তার থেকে কম স্কোর করেছে) কম নম্বর প্রাপ্ত পড়ুয়াদের বেসরকারি কলেজে মোটা টাকায় ডাক্তারি পড়ার পথ প্রশস্ত করছে। আমাদের দেশে ব্রেন ড্রেইন-এর হারও নিতান্ত কম নয়। স্নাতকদের দশ শতাংশ প্রতি বছর চলে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ায়। 'আনন্দ আশ্রম'-এর সেই ডাক্তার আজ কল্পনামাত্র। আমাদের দেশে জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট)-এর মাত্র ১.২ শতাংশ বরাদ্দ হয় স্বাস্থ্য খাতে। দাবি করা হয় তা ২.৫ শতাংশ করার জন্য। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ কম থাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলির দশা বেহাল। ফলে টারশিয়ারি সেন্টারগুলিতে অর্থাৎ বড় হাসপাতাল রেফার করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বড় হাসপাতালগুলিতে চাপ বাড়ে আর প্রাইভেট হাসপাতালগুলিতে বাড়ে মুনাফা। পর্যাপ্ত ডাক্তারের সংখ্যা কমতে থাকায় রোগী প্রতি সময় দেওয়া কমতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তার রোগীর সম্পর্কে ধরে চিড়। স্বাস্থ্যের মানবিক মূল্যবোধ বর্তমান নয়াউদারবাদী অর্থনীতির যুগে আর্থিক মূল্য মানে পরিণত হওয়ায় রোগী হয়ে উঠেছে উপভোক্তা, হাসপাতাল বিক্রয় কেন্দ্র এবং ডাক্তার সরবরাহকারি। ডাক্তার শ্রীনাথ রেড্ডির মতে ভারতে চিকিৎসার খরচ ২৫ থেকে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি হওয়ায় বার্ষিকভাবে ৫.৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নিমজ্জিত হয়, যাকে বলা হয় মেডিকাল পভার্টি ট্র্যাপ। এই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে উত্তর দমদম সমাজ কল্যাণ সমিতির পক্ষে শ্রী সুমিত ঘোষ এবং শ্রীমতি অনিন্দিতা সাহা সাক্ষাৎকার নিলেন শ্রী অশোক নাগ রায়-এর। শ্রী অশোক নাগ রায় ডাক্তার হিমাংশু রায়ের একদা সহকর্মী এবং বর্তমানে পেশায় একজন রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট এবং ইসিজি টেকনিশিয়ান।

আপনার কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলুন। 

কয়েকদিন আগে আমার কাছে একটা ছেলে এসেছে। হাত কেটে গেছে। সেলাই করে দিতে হবে। বলল, 'বেসরকারি হাসপাতাল গেছিলাম। ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা চাইছে'। আমি নিলাম কত? মাত্র ২০০ টাকা। আমরা যারা ডাক্তার না, মানে ডাক্তারের মত কাজ করছি আর কি, মানুষের আপদে বিপদে কাজ করছি, তাদের অনেক জায়গায় হাত-পা বাঁধা। একজন রোগীর বাড়ি গেছি। বললাম, 'মারা গেছেন'। পরিবারের লোকেরা বলল, 'একটু দেখুন না কিছু করা যায় কিনা। আসলে ডাক্তার ডেকেছিলাম, বলছে ৫০০ টাকা লাগবে'। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান মানুষ অনেক সময় পছন্দ করে, আবার কখনো পছন্দ করে না। কম পয়সায় কাজে মানুষের ঠিক বিশ্বাস নেই। একদিন ড্রেসিং করতে গেছি। বাবা-মা অতিশয় ভদ্র। হুট করে তাদের ছেলে এসে বলে, 'আপনার কোয়ালিফিকেশনটা কি'? আমি ১৯৬৯ সাল থেকে কাজ করছি আর এই ঘটনা মাত্র ছয় মাস আগের। বললাম, 'আমার কোয়ালিফিকেশন জেনে তুমি কি করবে? আমি তো ডাক্তারি করছি না, ড্রেসিংটুকু করছি'। ওর বাবা-মা আমার হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চায়। 

আপনার শুরুর কথা কিছু বলুন। 

আমি ১৯৬৮তে ম্যাট্রিক পাশ করি পূর্ব পাকিস্তানে। কলকাতায় চলে আসি। বাড়ি কাকিনাড়া। ১৯৬৯ সালে আমার ভাগ্নির অসুস্থতার কারণে আমি বেলঘরিয়ায় ডাক্তার হিমাংশু রায়ের কাছে যাই। ডাক্তারবাবু বললেন, 'আমার কাছে থাকো'। সেই থেকে তাঁর শেষ অব্দি আমি তাঁর সাথে থেকেছি। ১৯৮০ সালে আমি রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট হই। হাতে খড়ি ওনারই কাছে। চড় থাপ্পর লাথি খেতে খেতে কাজ শিখেছি উনার কাছে। আমার যা কিছু সব ওনার থেকেই পাওয়া। 

আপনার ভিজিট কত? 

আমার কোন ভিজিট বলে কিছু নেই। যে যা পারে দিয়ে যায়। কেউ দেয় না। আমার পয়সা কড়ির প্রতি বিশেষ আসক্তি নেই। কিন্তু আমি মেন্টালি স্যাটিসফাইড নই। মানুষ বড় বিচিত্র। তবুও যারা আমায় ভালবাসে, আমি তাদের জন্যই বেঁচে আছি। ১০০ টাকা মাইনেতে কাজ শুরু করেছিলাম। এখন আমার দিনে ১০,০০০ টাকা রোজগার করার ক্ষমতা আছে। কিন্তু করি না। অত পয়সার দরকার নেই। সেবামূলক কাজ করতে গেলে পয়সা দেখলে হয় না। তার জন্য মনোভাব চাই। আমার কাছে গরিব লোকেরাই বেশি আসে। আর যাদের পয়সা আছে, তারা যা দেয় তাতে বাকি ১০ জনকে বিনা পয়সায় দেখলেও আমার পুষিয়ে যায়। আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন ডাক্তার বাবুর ভিজিট ছিল ১০ টাকা। কলাবাগান নিমতায় ইনজেকশন দেওয়া হতো ৮ আনায়। তখন চা পেতাম, চিড়ে নারকেল মাখাও পেতাম। এখন ওসব নেই। আন্তরিকতা নেই। 

বেসরকারি নার্সিংহোমগুলি সম্পর্কে আপনার কি অভিজ্ঞতা? 

আগে মানুষ বাড়িতে মরত। এখন নার্সিংহোমে মরে। ৮০ বছরের রোগীকে দেখে আমরা বলতাম, 'বাড়িতে যত্নে রাখুন। দরকার পড়লে ডাকবেন'। এখন ডাক্তার এসেই বলে এক্ষুনি নার্সিংহোমে দিন, ভেন্টিলেশন ছাড়া রাখা যাবে না। ভেন্টিলেশন দিল। রোগী মরে গেল। দুদিন রেখে বিল এলো একলাখ টাকা। 

এখনকার চিকিৎসা পদ্ধতি কতটা উন্নত? 

ইনভেস্টিগেশন হয়, না চিকিৎসা হয়, আমি আমি ঠিক বুঝিনা। তবে চিকিৎসার চেয়ে ইনভেস্টিগেশন করে লাভ বেশি। আমি একটা রোগীকে দেখব, ৫০ টাকা পাব। রোগীর সামান্য জ্বর হয়েছে কিন্তু বলা হবে একটা লিভার ফাংশন টেস্ট করে নিন। ৪০০ টাকা। কমিশন ১০০ টাকা। এতেই লাভ বেশি। এখন প্রচুর ইনভেস্টিগেশন। কিন্তু একজন বিচক্ষণ ডাক্তারবাবু ভালো করে রোগীকে দেখবে তারপর কিছু মনে হলে তবেই টেস্ট করতে দেবে। রোগীদের দেখে কোথায়? সময়ই দেয় না। এখন ডাক্তারবাবুরা ভাবে তোমার জন্য আমার ব্রেন খাটিয়ে লাভ কি? কিন্তু আমি আমাদের ডাক্তারবাবুকে দেখেছি সব রোগীকে শুইয়ে দেখতেন। নমো নমো করে চিকিৎসা হয় না। হিমাংশুবাবুর কাছে রোগী এসেছে, তার বাবা বলছে, 'ডাক্তারবাবু আমার ছেলের মাঝে মাঝে বুকে ব্যথা হয়। না না, ওর হার্টে কিছু হয়নি। কিন্তু ডাক্তারবাবু ইসিজি করব না'? 'পয়সা কি বেশি হয়েছে আপনার'? সেই যুগ কি আর আছে?... ডিগ্রী তো আছে কিন্তু এখন ডাক্তারবাবুরা কোথায়? আমাদের ডাক্তারবাবু একবার রাত একটার সময় বিভা সিনেমার কাছে রোগী দেখতে গেছেন। আমি তখন তার ব্যাগ বাহক। ১০ মিনিট ধরে রোগীকে দেখে আমায় বললেন বাড়ি থেকে জিনিসপত্র নিয়ে আসতে। বুকে জল জমেছে। না বের করলে বাঁচবে না। রোগীর পরিজনরা বললেন, 'এক্সরে করতে হবে'? 'ডাক্তারিটা আমায় করতে দিন' - এই ছিল তাঁর দাপট। তখন স্টেরিলাইজেশন-এর যুগ আসেনি। গরম  জলে ধুয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে এলাম। দু লিটার জল বের করলেন। এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা কিছুই করতে লাগল না। 

এখনকার ডাক্তারদের কাছে আপনার কি পরামর্শ? 

ডাক্তারদের কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ, রোগীদের সম্পর্কে জানুন। তাদের কথা মন দিয়ে শুনুন। আজকাল ডাক্তারবাবুরা রোগীর গায়ে হাতই দেয় না। এই সেদিন আমার মিসেসকে নিয়ে গেছি একজন ডাক্তারবাবুর কাছে। উনার কিডনির প্রবলেম আছে। ডাক্তারবাবুর বিশাল নাম ডাক। টিভিতে আসেন। হাজার টাকা ভিজিট। উনি কিছু করেন না। ওনার অ্যাসিস্ট্যান্টরাই সব করে। রোগীর সবকিছু জেনে ইন্টারনেটে পাঠিয়ে দিল। ডাক্তারবাবু দেখে বললেন, 'আগের চেয়ে তো ভালই আছেন'। আমি বললাম, 'প্রেসারটা তো কমলো না'। বললেন, 'আরেকটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি'। অর্থাৎ আপনি যতক্ষণ বলবেন, উনি ততক্ষণ ওষুধ লিখে যাবেন। আপনার জ্বর হয়েছে, একটা ওষুধ। সর্দি, আরেকটা। এরকম করে চলতে থাকবে। শুধু প্রেসার-এর জন্যই দশটা ওষুধ। রোগী অত ওষুধের সাইডএফেক্ট-এই তো মরে যাবে। সব ওষুধের অপচয়। ভালো করে রোগীকে দেখে একটা ওষুধ দেব, সব ব্যামো সেরে যাবে। এটাই তো হওয়া উচিত। কিন্তু নার্সিংহোমে গেলেই এখন পঞ্চাশ হাজার টাকা বিল। আমার এক পরিচিত ওখানে গেছে। সিস্টার বলল, 'আপনি শুয়ে পড়ুন। ডাক্তার ঠিক আসবে'। কিন্তু ডাক্তার আর আসে না। রোগীর ছুটি হওয়ার সময় বিলে দেখা গেল রোজ ডাক্তার রাত দুটোয় এসে ঘুমন্ত অবস্থায় নাকি রোগীকে দেখে গেছে। তাতেই প্রতিদিন হাজার টাকা! আজকাল অক্সিজেন দিতে গেলে কত লাগে জানেন? পাঁচ হাজার টাকা। সামান্য সেলাই করতে ক পয়সা লাগে? ছুৃঁচ সুতোর কত দাম? মাথা ফাটলেই স্ক্যান করতে হবে? আমাদের সময় ডাক্তারবাবু বলতেন, 'যাও, রোগীর খবর নিয়ে এসো, কেমন আছে'। আজ কে কার খবর নেয়? রোগীদের সাথে ডাক্তারদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কারণ পয়সা। একটা সিজার করতে ১ লাখ টাকা লাগে। আমরা তো বাড়িতেই হয়েছি। আমার ছেলে হওয়ার সময় সিজার করতে গিয়ে ডাক্তার সবিতা সাহা পয়সাই নেননি। আমাদের ডাক্তারবাবুর বাড়িতে সিজার হত মাত্র ২০০০ টাকায়। এখন তো বাচ্চাদের আবার কি সব বাক্সে ফাক্সে ঢুকিয়ে রেখে দেয়। তার আবার আলাদা খরচা। এখন বাচ্চা জন্মে বাড়ি আসতে আসতে দেড় দু লাখ টাকা খরচ। 

মেডিক্লেইম... 

ওটা কি জানেন তো? ও কবে ফেল করবে, আমি তার অপেক্ষায় আছি। কোম্পানিগুলো কবে ওঠে, আমি তার অপেক্ষায় আছি। মেডিক্লেইম চিকিৎসা ব্যবস্থাটাকে শেষ করে দিয়েছে। এখন চিকিৎসা করার আগেই ডাক্তার জিজ্ঞেস করে নেয় মেডিক্লেইম আছে কিনা। 

সরকারি হাসপাতালে কতটা চিকিৎসা হয়? 

ডাক্তার আর রোগীর সম্পর্ক বন্ধুর মত হতে হবে। দুপক্ষেরই সহিষ্ণুতা দরকার। হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে যারা কাজ করে, দে নো নাথিং বাট দে ডু এভ্রিথিং। তবে হ্যাঁ, সরকারি হাসপাতালে ভালো কাজ হচ্ছে। খারাপ করছে। তবু করছে। চেষ্টা করছে। সরকারি হাসপাতালে আরও বেশি ডাক্তার দরকার। এমার্জেন্সিতে আরো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক দরকার। ডাক্তারদের আরও অ্যাসিস্ট্যান্ট দরকার। তারাই আসল কাজটা করে। 

ডাক্তারদের কাছে কি টার্গেট দেওয়া হচ্ছে? 

ডাক্তারবাবুরা আজ অনেক কোয়ালিফাইড। বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসছে কিন্তু কোথাও যেন ব্যবস্থাটা বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে। এই রোগী দেখলেই ১০ হাজার টাকা। ওই চিকিৎসা করতেই কুড়ি হাজার টাকা। ডাক্তারবাবুরা একটা বাইন্ডিং-এর মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। তারা মন মত কাজ করতে পারছে না। আমাকে যদি বলে, তুমি আমার ক্লিনিকে কাজ কর, তোমায় দিনে ৫০০-র বেশি সেলাই করতে হবে, আরে রোগী না এলে আমি সেলাই করব কাকে? আমার মনে হয় তাদের টার্গেট দেয়া হচ্ছে। তাই পয়সা বেড়ে যাচ্ছে। ডাক্তারদের ভিজিট কমানো উচিত। 

সর্বজনীন নিঃশুল্ক সরকারি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবা চাই। 

চাই সবার জন্য স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যের অধিকার।

Comments